ইরানের রাজনীতিতে সামরিকায়ন ও খামেনেই-পরবর্তী বাস্তবতা: একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ

ইরানের রাজনীতিতে সামরিকায়ন ও খামেনেই-পরবর্তী বাস্তবতা: একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ

Ahmad Rafi

প্রথম অধ্যায়: ‘ডিপ স্টেট’ হিসেবে আইআরজিসি এবং গ্যারিসন ইকোনমির উত্থান

আমার বিশ্লেষণের শুরুতেই আমি বলেছিলাম, ইরানের রাজনীতির চাবিকাঠি এখন আর ধর্মীয় নেতৃত্বের হাতে নেই। সেই চাবিকাঠি এখন ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) হাতে। আইআরজিসি আর শুধু একটি সামরিক বাহিনী নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ডিপ স্টেট’, রাষ্ট্রের ভিতরে আরেকটি রাষ্ট্র। এবং এই রাষ্ট্রের ভিত্তি হলো গ্যারিসন ইকোনমি বা সামরিক নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি।

গত কয়েক দশকে আইআরজিসি ইরানের অর্থনীতির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে—নির্মাণ থেকে টেলিকম, জ্বালানি থেকে বন্দর—একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছে। বর্তমানে দেশের মোট জিডিপির ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে আইআরজিসি ও তাদের অনুবন্ধী বনিয়াদগুলো। এই অর্থনৈতিক শক্তিই তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত শক্তি জুগিয়েছে।

২০২৬ সালের বাজেট বিশ্লেষণ করে আমি দেখেছি, জনকল্যাণ ও ভর্তুকির তুলনায় ডিজিটাল নজরদারি, বাসিজ মিলিশিয়া সম্প্রসারণ এবং অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নের জন্য বরাদ্দ চারগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি প্রমাণ করে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ এখন আর জনগণের কল্যাণে নয়, বরং শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাকে পুঁজি করে আইআরজিসি একটি বিশাল সমান্তরাল অর্থনীতি গড়ে তুলেছে, যা মূলত চোরাচালান এবং অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। এই ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন করে তুললেও, শাসকগোষ্ঠীর সম্পদ ও ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখছে।

২৮ ফেব্রুয়ারির প্রেক্ষাপট: ইসরায়েলি হামলায় আইআরজিসির শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর (ধারণা করা হচ্ছে নিহত) ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহের (নিহত) মতো ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এটি আইআরজিসির কমান্ড স্ট্রাকচারে একটি বড় ফাঁক সৃষ্টি করবে। এখন প্রশ্ন হলো, এই ফাঁক পূরণে আইআরজিসির অভ্যন্তরীণ উপদলগুলোর মধ্যে কে জিতে উঠবেন? কট্টরপন্থী কুদস ফোর্সের প্রভাব বনাম তুলনামূলক প্রাগম্যাটিক উইংয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব এখন আরও তীব্র হবে।

দ্বিতীয় অধ্যায়: খামেনেই-পরবর্তী উত্তরাধিকার সংকট—পরিকল্পনা বনাম বাস্তবতা

আপনারা জানেন, আমি গত কয়েক মাস ধরে খামেনেই-পরবর্তী উত্তরাধিকার নিয়ে গভীর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার বিশ্লেষণে আমি মোজতবা খামেনেইয়ের সম্ভাবনা এবং আইআরজিসির ‘ধর্মীয় আবরণ’ ব্যবহারের কৌশলটি চিহ্নিত করেছিলাম। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় খামেনেই নিহত হওয়ার পর, এই উত্তরাধিকার সংকট তাৎক্ষণিক ‘ক্ষমতা শূন্যতা’তে রূপ নিয়েছে।

Wikipedia-এর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরে বিশেষজ্ঞ পরিষদের একটি গোপন কমিটি উত্তরসূরি নির্ধারণে কাজ করছিল। মোজতবার নাম সম্ভাব্য তালিকায় ছিল, তবে তাঁর ধর্মীয় অযোগ্যতা ও বংশানুক্রমিক শাসনের বিতর্ক সব সময় ছিল। ২০২৫ সালের যুদ্ধের পর থেকে গুঞ্জন ছিল, একটি আইআরজিসি-নিয়ন্ত্রিত সামরিক জান্তা কার্যত খামেনেইকে সরিয়ে রেখেছিল। এখন সেই জান্তাই হয়তো সরাসরি ক্ষমতা কাঠামোয় আবির্ভূত হবে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বিশেষজ্ঞ পরিষদ (যার বর্তমান চেয়ারম্যান ৯২ বছর বয়সী মোহাম্মদ-আলি মোভাহেদি কেরমানি) কি দ্রুত নতুন নেতা নির্বাচন করতে পারবে? নাকি তারা আলি লারিজানি (যাকে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কার্যকরী ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল) বা অন্য কোনো ব্যক্তিত্বকে অস্থায়ী নেতা হিসেবে মেনে নেবে? প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানও হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিলেন। তিনি বেঁচে থাকলে এবং ক্ষমতার শূন্যতায় আইআরজিসি তাকে সাময়িকভাবে এগিয়ে রাখতে পারে কি না, তাও দেখার বিষয়।

তৃতীয় অধ্যায়: তরুণ প্রজন্ম ও বৈধতার সংকট

আমার গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ইরানের তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেনারেশন জেড (Gen Z)-এর আকাঙ্ক্ষা ও ক্ষোভ। গামান (GAMAAN) জরিপের তথ্য বলছে, মাত্র ১৬-২০% মানুষ বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন করে। ২০২২ সালের ‘মহিলা, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির বিক্ষোভ (যাতে শত শত মানুষ নিহত হয়েছে) এই বিচ্ছেদের প্রমাণ।

বর্তমান মুহূর্ত: ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইরানি জনগণকে সরাসরি রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শুধু বাইরের আহ্বানে বিপ্লব হয় না। আইআরজিসি-র দমনযন্ত্র এখনো শক্ত অবস্থানে আছে। তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ আছে, কিন্তু সংগঠিত নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা বাহিনীর অনুপ্রবেশের ভয় তাদের আন্দোলনকে এখন পর্যন্ত ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ স্তরেই রেখেছে। খামেনেইয়ের মৃত্যু এই ক্ষোভকে জ্বালানি দিতে পারে, কিন্তু সফল রূপান্তরের জন্য সংগঠন ও একটি বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন, যা এখনও অনুপস্থিত।

চতুর্থ অধ্যায়: আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা এবং ‘প্রতিরোধের অক্ষ’-এর পতন

আমার বিশ্লেষণের একটি কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ থেকে ‘অ্যাক্সিস অফ আইসোলেশন’-এ ইরানের রূপান্তর। আজ এই রূপান্তর সম্পূর্ণ হয়েছে।

প্রতিরোধের অক্ষের বর্তমান চিত্র: সিরিয়ার আসাদ সরকার এখনো টিকে থাকলেও তার ভূখণ্ডের বড় অংশ হারিয়েছে। হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের সাথে ২০২৫-২৬ সালের যুদ্ধে প্রচণ্ড ক্ষয়ক্ষতির শিকার। হামাসও গাজায় প্রায় নিঃশেষ। ইরান এই মিত্রদের দিয়ে ইসরায়েলের ওপর থেকে চাপ কমাতে পারলেও, নিজের ভূখণ্ডে শীর্ষ নেতৃত্বের পতন তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

আরব বিশ্বের অবস্থান: সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই সংকটে প্রকাশ্যে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তারা ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণের পথে আরও এগিয়ে যেতে পারে এবং ইরানের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ইরাক ও সিরিয়ায় নিজেদের প্রভাব বাড়াতে পারে। ইরানের আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা এখন চরম পর্যায়ে

পূর্বমুখী নীতির সীমাবদ্ধতা: রাশিয়া ও চীন এখন ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কিন্তু উভয় দেশই এই অস্থিরতায় সরাসরি সামরিকভাবে জড়ানোর সম্ভাবনা কম। তারা বরং নতুন শাসকগোষ্ঠীর সাথে কাজ করার পথ খুঁজবে, যদি তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ (তেল, পরমাণু প্রকল্প) রক্ষা হয়।

পঞ্চম অধ্যায়: ইরান কি উত্তর কোরিয়ায় পরিণত হবে?

আমার গবেষণার শেষ ধাপে আমি ইরানের এই ‘মতাদর্শিক সামরিক রাষ্ট্র’ মডেলটিকে উত্তর কোরিয়ার ‘সংগুন’ (Songun) বা সামরিক-প্রথম নীতির সাথে তুলনা করেছি। খামেনেই-পরবর্তী ইরান, বিশেষ করে যদি আইআরজিসির কট্টরপন্থী অংশ ক্ষমতা দখল করে, তাহলে একটি পারমাণবিক-সজ্জিত, কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র-এ পরিণত হওয়ার পথে হাঁটতে পারে।

মিল: উভয় দেশই চরম সামরিকায়ন, অর্থনীতির ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে টিকে থাকার কৌশল গ্রহণ করেছে। পারমাণবিক অস্ত্র তাদের জন্য চূড়ান্ত ‘বার্গেনিং চিপ’ এবং আত্মরক্ষার হাতিয়ার।

অমিল: ইরানের সমাজ উত্তর কোরিয়ার চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়, সংযুক্ত এবং তথ্য-প্রবাহের কাছে উন্মুক্ত। ইরানের তরুণ প্রজন্ম উত্তর কোরিয়ার নাগরিকদের মতো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। এই অভ্যন্তরীণ চাপ ইরানকে উত্তর কোরিয়ার মতো স্থিতিশীল বিচ্ছিন্নতার দিকে যেতে বাধা দিতে পারে।

ষষ্ঠ অধ্যায়: গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনা—একটি বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন

আমার গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল: খামেনেই-পরবর্তী ইরানে কি গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব? আমার উত্তর ছিল, এবং এখনো আছে: ইরানে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনা বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে কম।

কার্নেগি এন্ডোমেন্টের বিশিষ্ট গবেষক করিম সাজ্জাদপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সত্য তুলে ধরেছেন। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী বারবারা গেডেসের গবেষণা অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে বর্তমান পর্যন্ত স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর ২৫ শতাংশেরও কম ক্ষেত্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; অধিকাংশ ক্ষেত্রে আরেকটি স্বৈরাচারই এসেছে

খামেনেই-পরবর্তী ইরানের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত দৃশ্যপট হলো একটি দ্বি-পর্যায়ের প্রক্রিয়া:

প্রথম পর্যায়: আইআরজিসি কমান্ডার ও শাসকগোষ্ঠীর উপদলগুলোর মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হবে। এটিকে ‘প্যালেস কুপ’ বা প্রাসাদ অভ্যুত্থানের পরবর্তী অবস্থা বলে মনে হবে, কোনো সাম্রাজ্যের পতন নয়। সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কাঠামো রাতারাতি বিলীন হবে না।

দ্বিতীয় পর্যায়: এটি তখনই সম্ভব হবে যদি প্রথম পর্যায়ের সামরিক-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা দেশকে স্থিতিশীল রাখতে ব্যর্থ হয়—অর্থাৎ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, মর্যাদা বা পরিবর্তনের বিভ্রমও দিতে না পারে। তখন সাধারণ ইরানিরা একটি বাস্তব সুযোগ পেতে পারেন ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের।

উপসংহার ও পরবর্তী গবেষণার দিক

২৮ ফেব্রুয়ারির অভিযান ইরানের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আমি গত কয়েক মাসে যেসব বিষয় চিহ্নিত করেছিলাম—আইআরজিসির আধিপত্য, উত্তরাধিকার সংকট, আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা—সবগুলোই এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এখন গবেষণার মূল প্রশ্নগুলো হলো:

  1. আইআরজিসির অভ্যন্তরীণ গতিবিদ্যা: পাকপুরের নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত হলে কে তার স্থলাভিষিক্ত হবেন? হোসেইন সালামি কি ফিরে আসবেন? কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানি কি এখন আরও শক্তিশালী হবেন?
  2. বিশেষজ্ঞ পরিষদের ভূমিকা: এই পরিষদ কি দ্রুত নতুন নেতা নির্বাচন করতে পারবে, নাকি তারা আইআরজিসির চাপে পঙ্গু হয়ে যাবে? আলি লারিজানি বা সাদেক লারিজানির মতো ব্যক্তিত্বরা কি সামনে আসবেন?
  3. জনতার প্রতিক্রিয়ার মাত্রা: ট্রাম্পের আহ্বানে ইরানি জনগণ কি সাড়া দেবে? আবারও কি ১৯৭৯ সালের মতো ব্যাপক গণঅভ্যুত্থান সম্ভব, নাকি ২০০৯ সালের সবুজ আন্দোলনের মতো তা দমন করা হবে?

আমার গবেষণার পরবর্তী ধাপে আমি আইআরজিসির বিভিন্ন শাখা ও কমান্ডারদের বর্তমান অবস্থান এবং ইরানের বিভিন্ন শহর ও জাতিগোষ্ঠীর (কুর্দিস্তান, খুজেস্তান, বেলুচিস্তান) প্রতিক্রিয়া ও বিক্ষোভের খবর নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করব। এই তথ্যগুলো ইরানের ভবিষ্যৎ পথ কোন দিকে মোড় নেবে, তার ইঙ্গিত দেবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top